‘ফেক নিউজ’, একটি মনস্তাত্ত্বিক টীকা

আগস্ট ২০১৯
-প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়
ব্রিটেনের কার্ডিফ বিশ্ববিদ্যালয়ে ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সের অধ্যাপক। অর্থনীতি ও রাজনীতি নিয়ে বিশেষ আগ্রহ। বাংলা ও ভারতের বিভিন্ন সংবাপত্রে অর্থনীতি, রাজনীতি ও বিজ্ঞান বিষয়ক একাধিক প্রবন্ধ লিখেছেন। এছাড়াও লিখেছেন একাধিক কল্পবিজ্ঞান ও রহস্যকাহিনী।

২০১৬, ব্রিটেন ইউরোপীয়ন ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাবে কিনা সে প্রশ্ন নিয়ে সারা পৃথিবী মুখরিত। ‘ব্রেক্সিট’ এর পক্ষে এবং বিপক্ষে যে সব ব্রিটিশ নেতারা সওয়াল করেছেন তাঁরা জান লড়িয়ে দিচ্ছেন তথাকথিত নিরপেক্ষ ভোটারদের কাছে টানতে। তৎকালীন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী ডেভিড ক্যামেরন এবং তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গরা অবশ্য নিশ্চিত যে ব্রিটেনের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষই ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে থেকে যাওয়ার পক্ষে ভোট দেবেন। এহেন পরিস্থিতিতে ব্রিটেনের একাধিক সংবাদপত্রে দেখা গেল একটি বিজ্ঞাপন। সে বিজ্ঞাপন জানাচ্ছে অবিলম্বে অ্যালবানিয়া, ম্যাসিডোনিয়া, মন্টেনেগ্রো, সার্বিয়া এবং টার্কি (তুরস্ক) যোগ দিতে চলেছে ইওরোপীয়ন ইউনিয়নে। খবরটির গুরুত্ব বোঝাতে আবার লাল রঙ দিয়ে হাইলাইট করা বলা হয়েছে ‘সিরিয়াসলি’। বিজ্ঞাপনদাতারা সব শেষে ব্রিটেনের নাগরিকদের প্রতি আহবান জানিয়ে বলেছেন এই খবর শোনার পর ই-ইউ থেকে বেরোনো ছাড়া কোনো গতিপথ নেই। একই ধরনের খবর এর আগেও ছড়ানো হলে সে সব খবরের নিশানা ছিল মূলত তুরস্ক। ঠারেঠোরে এটাই বলার চেষ্টা করা হয়েছিল তুরস্কের বিপুল মুসলিম জনতা ই-ইউ তে ঢুকে পড়লে সন্ত্রাসবাদী আক্রমণ থেকে ব্রিটেনকে রক্ষা করার কোনো উপায়ই থাকবে না। নতুন বিজ্ঞাপনে শুধু ধর্মকে হাতিয়ার না করে দেখানো হল ইউরোপের সবথেকে দুর্বল দেশগুলি ঢুকে পড়তে চলেছে ইউনিয়নের মধ্যে, যার ফলে ব্রিটেনকে শুধু এক তরফা টাকা খরচাই করে যেতে হবে। পাওয়ার সম্ভাবনা কিছুই নেই।

অথচ ইউরোপীয়ন রাজনীতির হালহকিকত নিয়ে যারা সামান্য খবরটুকুও রাখতেন তাঁরা নিশ্চিতভাবেই জানতেন উপরোক্ত একটি দেশেরও ইউরোপীয়ন ইউনিয়নে ঢোকার সম্ভাবনা ছিল অতি নগণ্য। পাঁচটি দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সাফল্যে তুলনামূলক ভাবে তুরস্ক এগিয়ে থাকলেও তুরস্কের একনায়কতন্ত্রের কারণে পশ্চিম ইউরোপের দেশগুলি তুরস্ককে কোনোভাবেই ইউনিয়নে ঢুকতে দিতে চায় না। আর সার্বিয়া বা মন্টেনেগ্রোর মতন দেশগুলি ক্রিশ্চানপ্রধান হলেও অর্থনৈতিক সাফল্যের দিক ইউরোপীয়ন ইউনিয়নের মাপকাঠি ছুঁতেই পারেনি। উপরন্তু বসনিয়ায় গণহত্যা ঘটানোর জন্য সার্বিয়াকে ই-ইউ তে নিতে নৈতিক আপত্তিও আছে একাধিক দেশের। ব্রিটিশ সংবাদপত্রগুলির নিরীক্ষায় কিন্তু দেখা গেল বাস্তব তথ্য যাই হোক না কেন, বহু ব্রিটিশ মানুষই বিজ্ঞাপনটি দেখে আশাতীত সাড়া দিয়েছেন। ব্রেক্সিট ক্যাম্পের পক্ষে অবশ্যই।

অবশ্য এহেন বিজ্ঞাপন যে শুধু একতরফা ভাবে ব্রেক্সিটের সমর্থকরাই দিয়েছেন তাও নয়। গবেষণা দেখাচ্ছে ‘ফেক নিউজ’ সম্প্রচারে রাজনৈতিক আদর্শের বাছবিচার থাকে না। রক্ষণশীল ক্যাম্প বেশি ফেক নিউজ ছড়ালেও, তথাকথিত উদারপন্থীরাও পিছিয়ে নেই। প্রায় একই সময়ে ব্রেক্সিটের বিরোধীরা জানিয়েছিলেন ই-ইউ থেকে বেরিয়ে গেলেই ক্ষতি হবে ওরাংওটাংদের। শুনতে হাস্যকর হলেও অন্তর্নিহিত বক্তব্য হল, ই-ইউ থেকে বেরোলে ব্রিটেন পাম তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নেবে (যে নিষেধাজ্ঞা ই-ইউ’র দৌলতে বলবৎ রয়েছে বেশ কিছু বছর ধরেই), নির্বিচারে কাটা পড়বে ইন্দোনেশিয়ার পাম গাছ এবং নষ্ট হবে ওরাংওটাং দের বাসভূমি। এই খবরটিও বলা বাহুল্য অসত্য। প্রথমত, ব্রেক্সিট পরবর্তী ব্রিটেনের বাণিজ্য নীতি কী হবে তা জানা নেই, এবং পাম তেলের ওপর নিষেধাজ্ঞা তুলে নিলে যে ওরাংওটাং দের থাকার জায়গা থাকবে না এই কার্যকারণ সম্পর্কটিও সুনিশ্চিত নয়।

 

ফেক নিউজ– ব্রেক্সিটের পক্ষে ও বিপক্ষে

 

যারা ‘ফেক নিউজ’ ছাপছেন তাঁদের উদ্দেশ্যটা বোঝা যায়। রাজনৈতিক ক্ষমতা দখল বা অর্থনৈতিক লাভ মূল কারণ। কিন্তু যারা ফেক নিউজ ফেসবুক বা ট্যুইটারে শেয়ার করে চলেছেন তাঁদের উদ্দেশ্যটা কী? মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞান (সাইকোলজি) এবং আচরণগত অর্থনীতি (বিহেভিয়রাল ইকোনমিক্স) নিয়ে সাম্প্রতিক গবেষণা আলোকপাত করছে এই বিষয়ে। তবে এ গবেষণা নিতান্তই প্রারম্ভিক, সমস্ত তাত্ত্বিক ব্যাখ্যাকেই এখনো পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়নি। প্রমাণিত তত্ত্বগুলির মধ্যে দু’টি তত্ত্বকে নিয়ে কথা বলা যাক। প্রথমটির নাম মনস্তত্ত্বের ভাষায় ‘কনফার্মেশন বায়াস’, বাংলায় হয়ত যাকে বলা যায় পক্ষপাতদুষ্ট অনুমোদন। কী এই পক্ষপাতদুষ্ট অনুমোদন? একটি সরলরেখা কল্পনা করুন, যে সরলরেখার প্রতিটি বিন্দু আমাদের রাজনৈতিক মতাদর্শের প্রতিফলন। এই সরলরেখার প্রারম্ভিক বিন্দুটিতে তাঁরাই রয়েছেন যারা বামপন্থী মতাদর্শে বিশ্বাসী, ‘গণশক্তি’ র মতন খবরের কাগজ ছাড়া তাঁরা কিছুই পড়েন না। সরলরেখার একদম শেষে আবার রয়েছেন ঘোরতর দক্ষিণপন্থীরা, যাদের কাছে ‘জি নিউজ’ বা অর্ণব গোস্বামীর ‘রিপাবলিক টিভি’ই বেদবাক্য। যারা একেবারেই নিরপেক্ষ তাঁরা রয়েছেন একেবারে মধ্যবিন্দুতে। ধরা যাক এই মুহূর্তে এই মতাদর্শ রেখায় আপনার অবস্থান প্রারম্ভিক বিন্দু ও মধ্যবিন্দুর মাঝামাঝি কোথাও, অর্থাৎ আপনি সোশ্যালিজমের দিকে ঝুঁকে কিন্তু যে বামপন্থী রাজনীতিই সঠিক রাজনীতি কিনা সে নিয়ে কিছুটা দোলাচল রয়ে গেছে আপনার মনে। এমত পরিস্থিতিতে আপনার ফেসবুক ওয়ালে আচম্বিতেই একটি খবর ভেসে উঠল, যেখানে বারবার দেখানো হল দক্ষিণপন্থী রাজনীতি ঘোষিত আমূল বেসরকারীকরণের ফলে কিভাবে শুকিয়ে যাচ্ছে মহারাষ্ট্রের জলাধারগুলি। পানীয় সংস্থাগুলির একচেটিয়া জলব্যবহারের ফলে সাধারণ কৃষকদের জন্য কোনো জলই থাকছে না। ফলে ফুটিফাটা জমি ছেড়ে তাঁদের পাড়ি দিতে হচ্ছে শহরে। হয় ভিক্ষা করে নয়ত ভাগ্য সামান্য সহায় হলে মজদুরের কাজ করে তাঁদের জীবিকা নির্বাহ করতে হচ্ছে। খবরের শেষে, উপসংহারে, জানানো হয়েছে কৃষকদের উন্নতির জন্য বামপন্থী রাজনীতি ছাড়া গতি নেই।
আপনি খবরটি পড়ে যদি ফেসবুক বা ট্যুইটারে শেয়ার করেন, যদি বন্ধুবান্ধবদের পড়তে অনুরোধ করেন তাহলে আপনি ‘পক্ষপাতদুষ্ট অনুমোদন’ এর শিকার। বামপন্থী রাজনীতি নিয়ে আপনার চিন্তাধারাটি আপনার অবচেতনেই একটি অনুমোদনের অপেক্ষায় ছিল। ফেসবুকে ভেসে আসা খবরটি সেই অনুমোদনটুকুই দিয়েছে। হয়ত যার অ্যাকাউন্ট থেকে খবরটি এসেছে তিনিও এই এক কনফার্মেশন বায়াসের শিকার। এবার প্রশ্ন উঠবে খবরটি কী আদৌ ভুয়ো? না, ভুয়ো নয়। সফট ড্রিঙ্ক কোম্পানিরগুলির জল নিয়ে যথেচ্ছাচারের খবরটি সত্যি। কিন্তু একইরকম ভাবে সত্যি হল খবরটি সমস্যার শুধু একটি দিকই তুলে ধরেছে। মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞানী এবং আচরণবিদ অর্থনীতিদের কাছে ভুয়ো খবরের বৈশিষ্ট্য কিন্তু একাধিক। এবং একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হল খবরের একমাত্রিকতা (ওয়ন ডাইমেনশনালিটি)। এই খবরে জানানো হচ্ছে না রাজ্য সরকার বা কেন্দ্রীয় সরকার কত ভর্তুকি দিচ্ছে, জানানো হচ্ছে না পানীয় কোম্পানিগুলির ওপর এর আগে কী নিষেধাজ্ঞা বসেছে, জলের অপ্রতুলতাই কৃষকদের গ্রামছাড়ার একমাত্র কারণ নাকি ঋণের অপ্রতুলতাও দায়ী, চরম দক্ষিণপন্থী সরকারের আগে যে মধ্যপন্থী, সমাজবাদের দিকের ঝুঁকে থাকা সরকার ছিল তাদের আমলেই বা কী হাল ছিল কৃষকদের, এই গুলি নিয়ে কোনো আলোচনাই আপনি দেখতে পাননি খবরটিতে। ফলে আপনার মতাদার্শিক অবস্থানটি খুব সহজেই অনুমোদন পেয়ে গেছে আপনার অবচেতনের কাছে। ঠিক একই ভাবে যখন কোনো দক্ষিণপন্থী নিউজ প্ল্যাটফর্ম শুধু মাও এবং স্তালিনের আমলে হাজার হাজার মৃত্যুর খবর ছেপে বামপন্থাকে তুলোধোনা করে, মধ্যবিন্দু এবং প্রান্তিক বিন্দুর মধ্যে থাকা আপাত দক্ষিণপন্থী মানুষটিও সহজেই কনফার্মেশন বায়াসের শিকার হন।
আর যদি সত্যিই আপনার কাছে আসে এমন এক খবর যা সমস্ত দিকই খুঁটিয়ে বিচার করেছে, তখন কেন এই কনফার্মেশন বায়াস কাজ করে না? একেবারেই যে করে না সে কথা এখনো বলা যাচ্ছে না কিন্তু করার সুযোগ কম। কেন? কারণ, ‘কগনিটিভ লোড’ বা মনস্তাত্ত্বিক বোঝা। এবং শুনতে অবাক লাগলেও সম্ভবত প্রান্তিক বিন্দুগুলির দিকে ঝুঁকে পড়া মানুষগুলির জন্যই এই বোঝাটি বেশি ভারী। ধরা যাক, আপনি দক্ষিণপন্থী এবং নরেন্দ্র মোদী – অমিত শাহ র রাজনীতি পছন্দ করেন। এবং অর্ণব গোস্বামীর যুক্তি-তর্ক-গল্প সবসময়েই বিশ্বাস না করলেও অধিকাংশ সময়েই করেন। সেই আপনার কাছেই এমন একটি খবর পরিবেশিত হল যা বাম-ডান দু’দিক খুঁটিয়ে দেখে সমস্ত তত্ত্ব ও তথ্য সহযোগে পেশ করা হয়েছে। আপনি যেহেতু দক্ষিণ প্রান্তের বিন্দুটির প্রায় ঘাড়ে নিশ্বাস ফেলছেন, এই খবর দেখে আপনার প্রতিক্রিয়া কী হবে? বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন আপনার মতন ‘সিলেক্টিভ রিটেনশন’ ও ‘সিলেক্টিভ স্ক্রীনিং’ এর প্রাণপণ চেষ্টা করবেন। অর্থাৎ খবরের যে অংশগুলি আপনার রাজনৈতিক মতাদর্শের সঙ্গে মেলে সেগুলিকেই মাথায় রাখার চেষ্টা করবেন আর বাদ পড়বে সব বিপ্রতীপ খবর। কিন্তু খবরটি সত্য সত্যি বহুমাত্রিক হলে এই সিলেক্টিভ রিটেনশন ও সিলেক্টিভ স্ক্রীনিং প্রক্রিয়াটিতে আপনাকে বিনিয়োগ করতে হবে আপনার বৌদ্ধিক পুঁজি। সরল ভাষায় বলতে গেলে একটা দাম ধরে দিতে হবে। সেই মূল্য টা মনস্তাত্ত্বিক, এই যা। ভুয়ো খবর যখন পড়ছেন তখন এই বৌদ্ধিক পুঁজি বিনিয়োগের প্রশ্ন নেই, কারণ খবরটি একমাত্রিক হওয়ার দরুণ সিলেক্টিভ রিটেনশন বা সিলেক্টিভ স্ক্রীনিং এর ও দরকার পড়ে না।

একটু আগেই বলছিলাম, ভুয়ো খবর মানে শুধু একমাত্রিকতা নয়। তার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যও আছে। যেমন বহু ভুয়ো খবরই এমন কিছু কার্যকলাপ সম্পর্ক তুলে ধরে যা আদতেই বিদ্যমান নয়। বছর খানেক আগেই যেমন খবরে এসেছিল নিউ জার্সির একটি ছোট শহর। সংখ্যা দিয়ে ‘গান লবি’র প্রবক্তারা দেখিয়েছিলেন সেই শহরের মানুষ যত বেশি বন্দুক কিনেছেন, সে শহরের অপরাধ ততই কমেছে। নিচের গ্রাফটিও সেরকমই একটি কার্যকারণ সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করছে। দক্ষিণপন্থী থিঙ্ক-ট্যাঙ্ক ‘আমেরিকান এন্টারপ্রাইজ ইনস্টিটিউট’ এর একটি রিপোর্ট থেকে তুলে আনা এই গ্রাফে দেখা যাচ্ছে ১৯৯৩-২০০৩ সালের মধ্যে যত বেশি বন্দুক কেনা হয়েছে, ততই কমেছে বন্দুকজনিত অপরাধের হার।

 

রাশিবিজ্ঞান কিন্তু জানাবে এ নেহাতই ‘কো-রিলেশন’ অর্থাৎ আপাত সম্পর্ক। এমনকি ‘স্পুরিয়াস কো-রিলেশন’ অর্থাৎ অর্থহীন সম্পর্কও হতে পারে। যেমনভাবে একটি দেশের বাৎসরিক বৃষ্টিপাত আর বাৎসরিক পুত্রসন্তানের জন্মের হারের মধ্যে একটা অর্থহীন সম্পর্ক গড়ে তোলা যেতে পারে স্রেফ অন্ধের মতন স্ট্যাটিস্টিকাল সফটওয়ার চালিয়ে, ঠিক একইভাবে বন্দুকের মালিকানা আর অপরাধপ্রবণতা হ্রাসের মধ্যেও দেখানো যেতে একইরকম অবাস্তব সম্পর্ক। গ্রাফটি কিন্তু আদৌ বলছে না কুড়ি বছরে আমেরিকা জুড়ে কত বেশি পুলিস শহরে শহরে মোতায়েন করা হয়েছে, দেখাচ্ছে না দু’দশকে অপরাধদমনে সরকারী খরচ কত বেড়েছে, দেখাচ্ছে না চাকরির সংখ্যা কত বেড়েছে বা অপরাধপ্রবণ অঞ্চলগুলিতে স্কুলের সংখ্যা কত বেড়েছে। মোদ্দা কথা হল আমাদের কাছে কোনো তাত্ত্বিক কাঠামো নেই যা ব্যাখ্যা করতে পারে কেন বেশি বন্দুক কিনলে অপরাধ কমবে (বা কমবে না)। শুধু সংখ্যায় চোখ বুলিয়ে গেলে অবাস্তব সম্পর্ক ব্যতীত কিছুই পাওয়া যাবে না।
কিন্তু এহেন অবাস্তব সম্পর্ক বিভ্রান্ত পাঠকদের কাজে লাগে। ভারত বা চীনের বাণিজ্য বাড়ছে বলেই কী গ্লোবাল ওয়ার্মিং-ও বাড়ছে? আমেরিকায় বন্দুকের মালিকানা কেড়ে নিলে সত্যিই কী বন্দুকজনিত অপরাধ কমে যাবে? নরেন্দ্র মোদীর শাসনকালে হিন্দুত্ববাদের জয়জয়কারের জন্যই কী বেড়ে গেছে জাতিগত দাঙ্গা? এরকম হাজারো প্রশ্ন নিয়ে আপনি যদি বিভ্রান্ত থাকেন, জেনে রাখুন আপনি একা নন। এই সব প্রশ্নের উত্তর কী হতে পারে তা ভেবে মাথা চুলকোবেন অনেক মানুষই। তার কারণ, প্রশ্নগুলি মোটেও সহজ নয়। পক্ষপাতদুষ্টতা বাদ দিয়ে উত্তর খুঁজতে গেলে হয়রানি অনেক। একবগগা উত্তর পাওয়া যায় না বলেই বিভ্রান্তি বাড়ে। মনস্তত্ত্বের ভাষায় এই বিভ্রান্তিকে বলা হয় ‘কগনিটিভ ডিসোনান্স’। কগনিটিভ ডিসোনান্স বেশি মানেই বিভ্রান্তিও বেশি, কোন উত্তরটা ঠিক আর কোনটা বেঠিক সেই নিয়েই ঘোরতর সমস্যা। ভুয়ো খবর এই সমস্যাটারই সমাধান করে দেয় কার্যকারণবিহীন এক অবাস্তব সম্পর্ককে তুলে ধরে। মানুষ স্পুরিয়াস কো-রিলেশনকেই ভেবে নেন তাত্ত্বিক সত্য। কারণ জটিল প্রশ্নের উত্তর তাঁদের কাছে নিমেষে চলে আসছে। কমে যাচ্ছে ‘কগনিটিভ ডিসোনান্স’। জটিল প্রশ্নের সহজ উত্তর পেয়ে যাচ্ছেন বলেই নিমেষের মধ্যে ফেসবুক বা ট্যুইটারে তাঁরা সেই ভুয়ো খবর ছড়িয়েও দিচ্ছেন।

ভুয়ো খবরের ক্ষমতা ঠিক কতটুকু সে নিয়ে বিস্তর গবেষণা বাকি আছে। ২০১৬-র আমেরিকান নির্বাচনে সোশ্যাল মিডিয়ায় আসা ভুয়ো খবর বিশ্লেষণ করে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকরা দেখিয়েছেন নির্বাচনের ফলাফলে সেই খবরের প্রভাব অতি সামান্য। কিন্তু তাঁরা এটা বলতে ভোলেন নি যে নির্বাচন চলাকালীন আমেরিকার ভোটারদের ওপর ক্রমাগত চলেছে ভুয়ো খবরের আক্রমণ। সোশ্যাল মিডিয়ায় যে খবর তাঁরা পড়েছেন তা বহুলাংশেই ভুয়ো। ডোনাল্ড ট্রাম্পকে মসনদে হয়ত ভুয়ো খবর বসায়নি কিন্তু ‘পোস্ট-ট্রুথ’ বিশ্বে প্রতিদিন আমরা যে অগুন্তি ফেক নিউজ পড়ে চলেছি তা কী কম বড় সমস্যা? সে সমস্যার মূলে পৌঁছনোর জন্য মনস্তাত্ত্বিক বিজ্ঞান আমাদের বড় সহায় সে নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। গত দু’তিন বছরের গবেষণা ভেঙ্গে দিয়েছে অনেক পুরাতনী ধারণা। শুধু চমকপ্রদ শিরোনামের জোরেই ভুয়ো খবর জায়গা করে নিচ্ছে না সোশ্যাল মিডিয়ায় (ইদানিং ফেক নিউজের শিরোনামে চমক কমই থাকে), জায়গা করে নিতে পারছে আমাদের মনস্তাত্ত্বিক দুর্বলতার খাতিরে। কী প্রতিকার? সে উত্তরের জন্য ভরসা রাখতে হবে আগামী দিনের গবেষণার ওপরেই।

Add Comments